মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সামনে বৈরাগী বাজার (এক)

ময়নূর রহমান বাবুল:
লক্কর ঝক্কর মুড়ির টিন বাস গাড়ি। চলে যেন হামাগুঁড়ি দিয়ে। বাজারে বাজারে টং দোকানের সামনে গিয়েই দাঁড়ায়। যাত্রী নামায়। সীট খালি হয়না। যে দাঁড়ানো ছিলো সে বসে পড়ে। স্থান পূরণ হয়। রাস্তার মোড়ে, বটগাছের তলে ছাতা ছলা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী হাত তোলা দেয়। বাস থামে। আপার শ্রেণীর যাত্রীরা তেমন কিছু বলে না। লোয়ার কেলাসের কম পয়সা ভাড়া দেয়া যাত্রী বকা-বকি করে। রাগকরে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরাও। জায়গা নাই তবু যাত্রী তোলার অপরাধে ড্রাইভার হ্যান্ডুলম্যান গালি শোনে। বাসের ইঞ্জিন গরম হয়। বাস থামে পথের ধারে। সামনের বয়নেট খোলে ছোট একটা বালতি দিয়ে পানি ঢালে হ্যান্ডুলম্যান। পথের ধারের খাল থেকে কাঁদাযুক্ত আরেক বালতি পানি দৌঁড়ে আনতে গিয়ে পাশেই বসে সেরে নেয় নিজের শরীরের জলত্যাগটা। তারপর কাঁদাযুক্ত আরেক বালতি পানি নিয়ে আসে তাড়াতাড়ি। আবার ঢালে। যাত্রীদের দু’একজন ফূড়ন কাটে ঃ গাড়ির গলা শুকাইছে, পানি খাওয়াও। গাড়ির স্টাট বন্ধ হয়। ধূয়া দেখা যায়। ড্রাইভার আদেশ করে ঃ হ্যান্ডল মার পেদন। পেদন তার হ্যান্ডুলম্যানের নাম। মাত্রা ছাড়া বাংলা দ অক্ষরের মতো দেখতে লোহার একটা শিকল কাঠের সীটের তলা থেকে হাতে নেয় পেদন। গাড়ির নাকের ফুড়ে ঢুকিয়ে হ্যান্ডল ঘুরাতে থাকে। মাত্রা ছাড়া দ আকৃতির শিকলটা বৃত্তাকারে আস্তে আস্তে, তারপর খুব দ্রুত ঘুরাতে থাকে পেদন। তার এক ঝাকড়া চুল উপুড় হওয়া মাথায় ঝড়ের নারিকেল গাছের মতো দোলতে থাকে। ঘুরাতে ঘুরাতে একসময় গাড়ি চালু হয় প্রচন্ড ঝাকুনি দিয়ে। চিন্তায় পড়া বিমর্ষ যাত্রীগনের দু’ঠোঁটের মধ্যখানে এক ঝলক ফাঁক হয়। দু’ঠোঁটের ফাঁকে পান খেয়ে হলদে বা কালো হওয়া দাঁতগুলোর কিছু অংশ দেখে বুঝা যায় বাস চালু হওয়ায় তারা খুশী হয়েছেন।
ভাঙ্গা খানা-খন্দ আর ইট-পাথরের গর্ত ভাঙ্গা পেরিয়ে ক্যাচক্যাচ, ম্যাচম্যাচ শব্দে বাস সামনে আগায় কুচিয়া সাপের মতো। আয়ুব খাঁ মোনায়েম খাঁ রা বলেছিলো ঃ রাস্তা পীচঢালা হবে। কিন্তু বছরের পর বছর যায়, তা আর হয় না। ভোট হয়। নির্বাচন হয়। মৌলিক গনতন্ত্র আর মেম্বার চেয়ারম্যান হয়। এমপি এমএলএ হয়। রাস্তার পাশে বল্ডার ভাঙ্গা হয়। কিন্তু আমেরিকা চীন থেকে গালা আসে না। তাই পাকা হয় না। দুই ঘণ্টা লাগে ‘শর থেকে বৈরাগীর বাজার আসতে। সারাদিনে দু’টা মাত্র গাড়ি যায় আসে। লোয়ার কেলাসে ভাড়া কম। ফুলবানু গাদাগাদি করে এখানেই বসে। দাঁড়ানো যাত্রীর পাছার গুতা লাগে। তবু সে জড়সড় হয়ে বসে থাকে। সুরুজ পশ্চিম দিকে হেলে পড়ে। লক্কর ঝক্কর মুড়ির টিন বাসের পিছনে হাতল ধরে কাঠের সিঁড়িতে ঝুলে থাকা পেদন নামের হ্যান্ডুলম্যান গাড়ির টিনের বডিতে ধড়াস করে একটা থাপ্পড় মেরে চিৎকার দেয় ঃ সামনে বৈরাগীর বাজার। বৈরাগীর বাজার নামবে যেসব যাত্রী তারা সবাই নামার প্রস্তুতি নেয়।
ফুলবানুও তার পুটলাপুটলি হাতে নেয়। হাঁসমুরগীর খাঁচার মতো মুড়িরটিন বাসের লোয়ার কেলাস থেকে একগাদা বসা দাঁড়ানো মানুষকে আর মানুষের পাছাকে ঠেলে বেরিয়ে আসে। রাস্তার পাশে ঝড়ের ঝাপটায় ঝুলে থাকা জংধরা একটুকরা টিনের উপর ‘‘সামনে বৈরাগীর বাজার’’ লেখা সাইনবোর্ড খানা বাতাসে দোল খায়। বাস এসব ডিঙ্গিয়ে এসে সামনে দাঁড়ায়। ফুলবানু বাস থেকে নামে। সে জেনেছে যে, তার ঘরছাড়া বিরাগী মনু তাকে ফেলে এসে বাঁশের ব্যবসা করছে বৈরাগী বাজারে…

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!