মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

৭ বছরে ৮ খুন : সিলেটে বেসামাল ছাত্রলীগ, বাড়ছে লাশের মিছিল

সুরমা নিউজ:
কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না সিলেট ছাত্রলীগকে। ঘটছে একের পর এক ঘটনা। পড়ছে লাশও। আর এসব ঘটনায় বিব্রত হয়ে পড়েছেন সংগঠনটির সিনিয়র নেতারা। গ্রুপ-উপগ্রুপ বেশি হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না নেতা-কর্মী-সমর্থকদের। সিলেটে ছাত্রলীগের লাশের মিছিল অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৭ বছরে সংগঠনের ৮ কর্মী খুন হয়েছেন। স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকে বারবার নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এ অঙ্গসংগঠন। দলের নেতাদের আশকারা পেয়ে তারা হয়ে ওঠে আরো বেপরোয়া। কোন কোন ক্ষেত্রে নিজেদের কর্মীকেও অস্বীকার করে ছাত্রলীগ। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু বিচার, দোষীদের গ্রেপ্তারের মুখস্থ বাণী আওড়ালেও কিছুদিন পরই তা অতীত হয়ে যায়। আবার যখন কোন প্রাণহানির ঘটনা ঘটে তখন আবার আলোচিত হয় বিগত দিনে নিজ দলের কর্মীদের হাতে বলি হওয়া দুর্ভাগা কর্মীদের কথা। অথচ সামান্য রেষারেষির কারণে খালি হচ্ছে কতো মায়ের কোল। এসব পরিবারের একটাই প্রশ্ন, এভাবে আর কতো মায়ের কোল খালি হবে? বিচারের বাণী কী এভাবেই নিভৃতে কেঁদে যাবে? সর্বশেষ এই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হলেন ছাত্রলীগকর্মী ওমর আহমদ মিয়াদ। নিহত মিয়াদ লিডিং ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে লেখাপড়া করছিলেন।
গতকাল সোমবার বেলা ৩টার দিকে টিলাগড় মসজিদের সামনে কয়েকজন যুবক অতর্কিত হামলা চালায় মিয়াদের উপর। এসময় তার বুকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে সিলেটের শিবগঞ্জে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হন সুরমা গ্রুপের ছাত্রলীগকর্মী জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের মা আতিয়া বেগম নিজে বাদী হয়ে পরদিন বৃহস্পতিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) শাহপরাণ থানায় এমসি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা টিটু চৌধুরীসহ ২২ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
মাসুমকে খুন করা হয়েছিলো ফিল্মি স্টাইলে। ওইদিন টিটু চৌধুরীর অনুসারী কয়েকজন ছাত্রলীগকর্মী মাসুমের ছোটভাই খালেদকে শিবগঞ্জ লামাপাড়া এলাকায় জিম্মি করে মাসুমকে খবর দেয়। ঘটনাস্থলে মাসুম আসার পরপরই তাকে ছুরিকাঘাত করতে থাকে জিম্মিকারীরা। পরে মাসুমকে উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে বিকেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মাসুম-মিয়াদের আগে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে খুন হন ছাত্রলীগকর্মী উদয়ন্দু সিংহ পলাশ, সুমন চন্দ্র দাশ, আব্দুল আলী, কাজি হাবিবুর রহমান, আব্দুল্লাহ কঁচি ও খালেদ আহমদ লিটু।

উদয়েন্দু সিংহ পলাশ: ২০১০ সালের ১২ জুলাই অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে নগরীর টিলাগড়ে খুন হন এমসি কলেজের গণিত বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগকর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন পলাশের বাবা বীরেশ্বর সিংহ। এই মামলা এখন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন শাহপরাণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতার হোসেন।

আব্দুল্লাহ কঁচি: ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই সিলেট নগরীর মদিনা মার্কেট-কালিবাড়ি রোডের মদিনা মার্কেট অংশে ইজিবাইকের (টমটম) একটি নতুন স্ট্যান্ডের দখল নিয়ে স্থানীয় নেতা ইমরান আহমদ ও গোলজার আহমদ গ্রুপের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এসময় ছাত্রলীগকর্মী আবদুল্লাহ ওরফে কঁচি নিহত হয়। এ ঘটনায় কঁচির ভাই আসাদুল হক ভূঁইয়া বাদী হয়ে ৮ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটি এখন সিআইডিতে তদন্তাধীন আছে বলে জানিয়েছেন জালালাবাদ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম।

সুমন চন্দ্র দাস: ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবি) আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রলীগের পার্থ-সবুজ গ্রুপের সাথে অঞ্জন-উত্তম গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধ হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও ছাত্রলীগকর্মী সুমন চন্দ্র দাস। এ ঘটনায় সুমনের মা প্রতিমা দাস বাদী হয়ে ছাত্রলীগের অজ্ঞাতনামা শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এই মামলাটিও এখন সিআইডি তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন জালালাবাদ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম।

খালেদ আহমদ লিটু: চলতি বছরের ১৭ জুলাই সোমবার দুপুরে সিলেটের বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের ১০২নং শ্রেণি কক্ষের ভিতরে নিজেদের অবস্থানে পাইপগানের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন জেলা ছাত্রলীগের আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক পাভেল গ্রুপের কর্মী খালেদ আহমদ লিটু। ঐদিন বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আবুল কাশেম পল্লব ও জেলা ছাত্রলীগের আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক পাভেল মাহমুদ গ্রুপের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন উপজেলা ছাত্রলীগকর্মী খালেদ আহমদ লিটু (২৩)। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওই রাতেই নিহত লিটুর বাবা ফয়জুর রহমান বাদী হয়ে পাভেল গ্রুপের ছাত্রলীগকর্মী ফাহাদ আহমদসহ মোট সাতজনকে আসামি বিয়ানীবাজার থানায় মামলা করেন।

আব্দুল আলী: ২০১৫ সালের ১২ আগস্ট দুপুর আড়াইটায় সিলেট মদনমোহন কলেজ ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিজ দলের ক্যাডারদের ছুরিকাঘাতে খুন হন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার থানার সিলাম তেলিপাড়া গ্রামের আকলিস মিয়া আরকানের ছেলে আব্দুল আলী (১৯)। তিনি ছাত্রলীগ বিধান সাহা গ্রুপের সক্রিয় কর্মী ছিলেন।

ঘটনার দিন বিকেলে দক্ষিণ সুরমা থানার চণ্ডিপুলস্থ ফুলকলি মিষ্টিঘর থেকে আটক করা হয় মূল ঘাতক সিলেটের ওসমানীনগর থানার দয়ামীর গ্রামের চিত্তরঞ্জন দাশের ছেলে প্রণজিৎ দাশ ও সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের বাসিন্দা হারুনুর রশিদের ছেলে আঙ্গুর মিয়া। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০১৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রণজিত দাশ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। এই মামলাটি এখন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালি থানার ওসি গৌছুল হোসেন।

কাজী হাবিবুর রহমান: ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ছাত্রলীগের গ্রুপিংয়ের শিকার হন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও ছাত্রলীগকর্মী কাজী হাবিবুর রহমান। ঐদিন সকাল সাড়ে ১১টায় নগরীর শামীমাবাদে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাঠে ছাত্রলীগ নেতা হোসাইন মুহাম্মদ সাগর ও সোহেলের নেতৃত্বে একদল ছাত্রলীগকর্মী তার উপর হামলা চালায়। এসময় হাবিবকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তারা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় হাবিবের। এ ঘটনায় ২০১৬ সালের ২০ জানুয়ারি নিহতের ভাই ১১ জনের নাম উল্লেখ করে কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন। এই মামলার সকল আসামিরা জামিনে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালি থানার ওসি গৌছুল হোসেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!